Sat. Jun 19th, 2021

সিলেট টেলিগ্রাফ

সত্য প্রকাশে অবিচল

ভালোবাসতে হলে দেশকে জানতে হয়- প্রণবকান্তি দেব

1 min read

 3,453 total views,  2 views today

ইদানীংকালে সবচেয়ে বেশী কানে বাজা দুটি শব্দের একটি হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ এবং আরেকটি হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ’। শিক্ষিত, অশিক্ষিত প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের ফায়দা হাসিলের স্বার্থে এই শব্দযুগল নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে। ফলে শব্দদুটির যে অন্তর্গত ভাব, যে গৌরব, যে মহিমা, যে তেজ তা অনেকটা তমসায় ঢেকে যাচ্ছে। একটি জাতির সবচেয়ে গৌরবের বিষয়গুলো যখন হীন স্বার্থসিদ্ধির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়, তখন বুঝতে হবে এক ঘোর অমানিশায় পতিত সে জাতির ভবিষ্যত।সময়টা তুমুল বিভ্রান্তিকর। চিন্তার বিভ্রান্তি, ভাবের বিভ্রান্তি, নীতি আর আদর্শগত বিভ্রান্তি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ায় যে দিকে চোখ যায় কেবল সরকার সমর্থক, কেবল আওয়ামী লীগ, কেবল মুজিব আদর্শের সৈনিক। কিন্তু এদের দৈনন্দিন জীবন বিশ্লেষণ করলে বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনা। বরং কোনো সংকট দেখা দিলে বেরিয়ে আসে প্রকৃত রূপ। একথা এখন প্রায়শই শোনা যায় যে, সরকারী দলে ঘাপটি মেরে বসে আছে প্রতিক্রিয়াশীলরা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীরা এবং কখনো কখনো এর প্রমাণও মেলে। খুব সুক্ষ্মভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা শিকড় গেঁড়ে বসতে চাইছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রত্যেকটি অঙ্গনে কৌশলে চলছে মৌলবাদের তোষণ।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানা তরুণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করবে কীভাবে অথবা বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম না জেনে মুজিব আদর্শ? এই যে, আজ একটা তমসাচ্ছন্ন সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি, ক্ষমতা ভোগের সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করছি রাজনৈতিক পরিচয়কে তাদের পক্ষে দেশকে আপন করে নেয়া সম্ভব নয়। আর দেশকে আপন মনে করতে না পারলে জীবনের কোনো অর্থ দাঁড়ায় না।

সবচেয়ে ভয়াবহতম ব্যাপার হলো আমাদের তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই নানারকম বিভ্রান্তি আর ধর্মীয় উন্মাদনার মধ্য দিয়ে বড়ো হচ্ছে। যেকোনো ইস্যুতে উগ্রবাদী আচরণ তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেই সুযোগে নষ্ট রাজনীতি তাদের ব্যবহার করছে। মগজ ধোলাই করে ভেতরে পুঁতে দেয়া হচ্ছে জঙ্গিবাদের বীজ। খুব সহজেই তারা লুফে নেয় সে সুযোগ। এর মূল কারণ দেশকে না জানা, দেশটা কীভাবে এলো সে ইতিহাস না জানা, দেশপ্রেম না থাকা।

রবি ঠাকুর এর এ কথাটি আমি প্রায়শই বলি যে, ‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। যতক্ষণ দেশকে না জানি, ততক্ষণ সে দেশ আপনার নয়।’ কথা সেখানেই, দেশটা আপন হতে হলে, দেশকে ভালোবাসতে হলে দেশের ইতিহাস জানতে হয়। এই যে, আজ একদিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, জল, স্থল অতিক্রম করে মহাকাশপানে ছুটে চলা আর অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, মূল্যবোধের অবক্ষয়, চিন্তার দৈনতা, তার মূলে কারণ তো একটাই- ইতিহাস না জানা, দেশকে আপন করে নিতে না পারা। এই যে আজ একদিকে পদ্মা সেতুর গৌরব আর অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বিরোধীতা, এই যে বুদ্ধিজীবী দিবসে বিজয় দিবসের আলোক সজ্জা, কোথায় শ্লোগান দিতে হয় আর কোথায় শ্রদ্ধায় মৌন মাথা নোয়াতে হয় সেটা না জানা এর মূল কারণই তো শিকড়ের খোঁজ না করা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন একদিন বেহাত হতেই পারে।

আমাদের তারুণ্যের যে অংশটুকু রাজনীতির সাথে জড়িত তাদের পড়াশোনা কতটুকু! অধ্যয়ন কিংবা রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ কতটুকু! আমি জানি না যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে বলে প্রচার করেন তারা কতোজন জাহানারা ইমাম এর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থগুলো পড়েছেন এবং হৃদয়ঙ্গম করেছেন। এটা আমার বিশ্বাস, যারা অন্তত পক্ষে এই গ্রন্থগুলো পড়েছেন তারা কখনো দেরি করে অফিসে যান না, ঘুষ খান না, দ্রব্যমূল্য মজুত করেন না, অর্থের বিনিময়ে রাজনীতিক কমিটি গঠন করেন না, রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করেন না- মোট কথা মানুষের কষ্ট হয় এমন কোন কাজ করেন না। যদি তা-ই হয়, তবে এটাই তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এটাই তো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানা তরুণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করবে কীভাবে অথবা বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম না জেনে মুজিব আদর্শ? এই যে, আজ একটা তমসাচ্ছন্ন সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি, ক্ষমতা ভোগের সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করছি রাজনৈতিক পরিচয়কে তাদের পক্ষে দেশকে আপন করে নেয়া সম্ভব নয়। আর দেশকে আপন মনে করতে না পারলে জীবনের কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। বড়ো ভাই, বড়ো মিছিল আর মামা, চাচা দিয়ে কোনো মতবাদ কিংবা বিশ্বাস তৈরি হতে পারে না, বড়ো জোর কিছু সুবিধা গ্রহণের পথ তৈরি হতে পারে কিছু দিনের জন্য।

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জীবনের এক হিরন্ময় অধ্যায়। আত্মবলিদানের এমন ইতিহাস পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। আর মুজিব জীবনের যে সংগ্রাম, গণমানুষের মুক্তির জন্য আত্মোৎসর্গের যে উদাহরণ তার তুলনাও বিরল। এই দুoটো বিষয়কে বুকের গভীরে নিলেই বাংলাদেশের তারুণ্যের মনোজগতে আর কোনো ধুয়াশা থাকার কথা নয়। আসলে ভালোবাসতে হলে দেশকে জানতে হয়, দেশের ইতিহাস জানতে হয়।

প্রণবকান্তি দেব। শিক্ষক ও সংগঠক।

সৌজন্যে- সিলেট ভয়েস।

Ad
সম্পাদক : যীশু আচার্য্য II স্বপ্নীল ৬৪ মির্জাজাঙ্গাল, সিলেট II ফোন: ০১৭১৯-৭৩৩৫৪৯ | Newsphere by AF themes.
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.